চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট): সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) একটি নির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ কবিতা, যেখানে ১৪টি চরণ ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ইতালীয় কবি পেট্রার্ক দ্বারা জনপ্রিয় করা হয় এবং পরবর্তীতে শেকসপিয়ার ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের দ্বারা সমৃদ্ধ করা হয়। নির্দিষ্ট ছন্দবদ্ধতা, মিলের ধরণ ও ভাবগাম্ভীর্য এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এই কন্টেন্টে সনেটের সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট): সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল
চলুন জেনে নেওয়া যাক "চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট): সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল" সম্পর্কে বিস্তারিত।

ভূমিকা

সাহিত্যের জগতে কবিতার নানা শৈলী ও কাঠামো দেখা যায়, যার মধ্যে চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট অন্যতম। এটি একটি নির্দিষ্ট ছন্দবদ্ধ ও কাঠামোগত নিয়ম মেনে রচিত হয়, যেখানে মাত্র ১৪টি চরণে গভীর ভাবপ্রকাশ ঘটে।

চতুর্দশপদী কবিতার উদ্ভব ঘটে ১৩শ শতকে ইতালীয় কবি পেট্রার্কের হাত ধরে, যা পরবর্তীতে শেকসপিয়ার, জন মিল্টন ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো কবিদের সৃষ্টিতে আরও সমৃদ্ধ হয়। ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে সনেট গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে, কারণ এতে প্রেম, প্রকৃতি, দর্শন ও মানবজীবনের নানান দিক ফুটে ওঠে।

নির্দিষ্ট ছন্দবিন্যাস, মিলের ধরন ও গঠনগত শৃঙ্খলার কারণে সনেট অন্যান্য কবিতা থেকে আলাদা। এর দুটি প্রধান ধরণ হলো ইতালীয় (পেট্রার্কীয়) সনেট ও ইংরেজি (শেকসপিয়ারীয়) সনেট, যেগুলো ভিন্ন ছন্দ ও বিন্যাসে রচিত হয়। বাংলা সাহিত্যেও সনেট বিশেষ স্থান অধিকার করেছে, বিশেষ করে মাইকেল মধুসূদন দত্তের "চতুর্দশপদী কবিতাবলী" বাংলা সনেটের ভিত্তি স্থাপন করে।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট)

চতুর্দশপদী কবিতা, যা সনেট নামে পরিচিত, একটি নির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ কাব্যরূপ যেখানে মোট ১৪টি চরণ থাকে। প্রতিটি চরণ সাধারণত নির্দিষ্ট মাত্রা ও মিল অনুসরণ করে, যা কবিতার ছন্দবদ্ধতাকে আরও মধুর ও শ্রুতিমধুর করে তোলে।। এটি সাধারণত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়— অষ্টক (Octave) ও ষষ্টক (Sestet)।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) এর বৈশিষ্ট্য

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট একটি বিশেষ ধরনের কবিতা, যা নির্দিষ্ট কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে নিজস্ব পরিচিতি অর্জন করেছে। সনেটের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
  • ১৪টি চরণঃ সনেটের মূল বৈশিষ্ট্য হল এটি ১৪টি চরণ নিয়ে রচিত হয়। এই চরণগুলি একটি নির্দিষ্ট ছন্দবদ্ধ কাঠামো অনুসরণ করে, যা কবিতার সৌন্দর্য ও ছন্দে ভারসাম্য তৈরি করে।
  • নির্দিষ্ট ছন্দ ও মাত্রাঃ সনেটে সাধারণত ইম্বিক পেন্টামিটার (iambic pentameter) ব্যবহার করা হয়, যা প্রতি চরণে ১০টি শব্দ বা সিলেবেল থাকে। এর মাধ্যমে কবিতার শব্দগুলো আরও মধুর ও গতি সম্পন্ন হয়।
  • প্রধান ধরণঃ সনেটের দুটি প্রধান ধরণ রয়েছে-
    • ইতালীয় (পেট্রার্কীয়) সনেট: এই ধরণে ৮ চরণের অকটেভ এবং ৬ চরণের সেসটেট থাকে। অকটেভে সাধারণত সমস্যার বা অবস্থার বর্ণনা হয়, আর সেসটেট সমাধান বা পরিণতি প্রদর্শন করে।
    • ইংরেজি (শেকসপিয়রীয়) সনেট: এতে ৩টি কোয়াট্রেইন (৪ চরণ) এবং ১টি কাপলেট (২ চরণ) থাকে। তিনটি কোয়াট্রেইনে সাধারণত আলোচনার বিষয়, এবং কাপলেটে কবিতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা পরিণতি প্রকাশ করা হয়।
  • মিলের ধরণঃ সনেটের চরণগুলিতে রাইম স্কিম (Rhyming scheme) রয়েছে, যা সাধারণত নির্দিষ্ট থাকে।
    • ইতালীয় সনেটে মিলের ধরণ ABBA ABBA থাকে, যেখানে প্রথম অষ্টকরের চরণে একটি নির্দিষ্ট মিল থাকে এবং দ্বিতীয় সেসটেটের চরণে আরেকটি মিল।
    • ইংরেজি সনেটে মিলের ধরণ সাধারণত ABAB CDCD EFEF GG থাকে, যেখানে প্রথম তিনটি কোয়াট্রেইনে আলাদা মিল থাকে এবং শেষের কাপলেটে একটি শেষ মিল।
  • ভাবনাগত গঠনঃ সনেট সাধারণত ভবিষ্যত চিন্তা বা মানবিক অনুভূতি প্রকাশ করে থাকে। এটি গভীর ভাবনা, প্রেম, দুঃখ, প্রকৃতি, দর্শন বা যত্নশীল রচনামূলক বিষয় নিয়ে লেখা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সনেট একটি সমস্যা বা প্রশ্ন তুলে ধরে এবং শেষে তার সমাধান বা উত্তর প্রদান করে।
  • ছন্দ ও ভাষার সৌন্দর্যঃ সনেটের কবিতায় ছন্দ এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে কবি তার অনুভূতিকে শক্তিশালী এবং সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। সনেটের মাধ্যমে কবি তার ভাবনাকে খুবই সংক্ষিপ্ত এবং সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করেন।
  • কাব্যিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ সনেটের একটি বিশেষ লক্ষ্য থাকে, তা হলো একটি নির্দিষ্ট ভাব প্রকাশ করা বা যত্নসহকারে চিন্তা তুলে ধরা। এটি প্রচলিত কবিতার তুলনায় অধিকভাবে নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে, যা কবিতার প্রভাব ও গভীরতা বাড়ায়।
এসব বৈশিষ্ট্য সনেটকে বিশেষ একটি কবিতার ধরন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এই কবিতা ধারার মাধ্যমে কবি তার ভাবনাকে শক্তিশালীভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) এর ইতিহাস

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের ইতিহাস দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ। এর সূচনা হয় ইতালিতে এবং পরবর্তীতে এটি ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সনেটের উত্থান এবং বিকাশে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে কিছু বিশিষ্ট কবি, বিশেষ করে পেট্রার্ক, শেকসপিয়ার, এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

ইতালিতে সনেটের জন্ম (১৩শ শতক)

সনেটের ইতিহাস শুরু হয় ১৩শ শতকের ইতালিতে। ইতালীয় কবি ফ্রান্সেস্কো পেট্রার্ক সনেটের প্রথম খ্যাতনামা রচয়িতা। তিনি তার সনেটগুলির মাধ্যমে প্রেম ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর গভীর অনুভূতি এবং দর্শনীয় ভাব প্রকাশ করেছিলেন। 

পেট্রার্ক তাঁর সনেটগুলিতে "ডলচে স্টিল নুোভো" (sweet new style) এর সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা সনেটের বিশেষ একটি প্রেমমূলক ধরন তৈরি করে। তাঁর সনেটের কাঠামো ছিল আটটি চরণে একটি অকটেভ এবং ছয়টি চরণে একটি সেসটেট।

ইংরেজি সাহিত্যে সনেটের প্রচলন (১৫শ-১৬শ শতক)

সনেট ইতালিতে জনপ্রিয় হওয়ার পর, এটি ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে ১৫শ শতকের শেষে। ইংরেজি কবি হেনরি হাওল্যান্ড, সির টমাস উইট এবং পরে উইলিয়াম শেকসপিয়ার সনেটকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন। 

শেকসপিয়ারের সনেটগুলি বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে তিনি প্রেম, দুঃখ, জীবন, এবং মানবিক অনুভূতিগুলির গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। শেকসপিয়ারের সনেটে ইংরেজি সনেটের কাঠামো স্থাপন হয়, যেখানে তিনটি কোয়াট্রেইন (৪ চরণ) এবং একটি কাপলেট (২ চরণ) থাকে, এবং রাইম স্কিম ABAB CDCD EFEF GG।

বাংলা সাহিত্যে চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) এর প্রবর্তন (১৯শ শতক)

বাংলা সাহিত্যে সনেট প্রথম জনপ্রিয় করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ১৮৬০ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনা করেন এবং তার কবিতাগুলি বাংলার প্রেক্ষাপটে সনেটের প্রথা প্রতিষ্ঠা করে। 

মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সনেটের একটি নতুন ধারার সূচনা করেন এবং এটি প্রেম, প্রকৃতি, মানবতার মতো বিষয় নিয়ে রচিত হতে থাকে। তার সনেটগুলি ইংরেজি সনেটের আদলে লেখা হলেও বাংলা ভাষার সাথে তার গভীর সংযোগ সৃষ্টি করে।

আধুনিক যুগে চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট)

২০শ শতকে সনেটটি আধুনিক কবিতার অংশ হিসেবে বিকশিত হয়। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় আধুনিক কবিরা সনেটের কাঠামো পরিবর্তন করতে শুরু করেন। তারা সাধারণত সনেটের ঐতিহ্যগত ছন্দ এবং কাঠামো অনুসরণ করলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে অনেক নতুনত্ব নিয়ে আসেন।

সার্বিকভাবে, সনেটের ইতিহাসে এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায়, সংস্কৃতিতে এবং ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। সনেটের কাঠামো এবং বিষয়বস্তু, দুই দিক থেকেই এটি কবিতা প্রেমীদের কাছে একটি অমূল্য রচনা হিসেবে পরিগণিত।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) রচনার কৌশল

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট রচনার কৌশল একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও নিয়ম অনুসরণ করে। সনেট লেখার জন্য যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল রয়েছে, তা হলো:
  • সঠিক কাঠামো অনুসরণ করা- সনেট সাধারণত ১৪টি চরণে রচিত হয়, এবং এর দুটি প্রধান ধরণ রয়েছে:
    • ইতালীয় সনেট (পেট্রার্কীয়): এতে ৮টি চরণের অকটেভ এবং ৬টি চরণের সেসটেট থাকে। অকটেভে সাধারণত একটি সমস্যা বা প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করা হয়, এবং সেসটেটে তার সমাধান বা পরিণতি প্রদান করা হয়।
    • ইংরেজি সনেট (শেকসপিয়রীয়): এতে ৩টি কোয়াট্রেইন (৪ চরণ) এবং ১টি কাপলেট (২ চরণ) থাকে। প্রতিটি কোয়াট্রেইনে একটি ধারণা বা প্রস্তাবনা প্রদর্শন করা হয়, এবং কাপলেটে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সিদ্ধান্তের প্রকাশ ঘটে।
  • ছন্দ ও মাত্রা (ইম্বিক পেন্টামিটার)
    • সনেটে সাধারণত ইম্বিক পেন্টামিটার (iambic pentameter) ব্যবহার করা হয়। এতে প্রতি চরণে ১০টি সিলেবেল (৫টি অ্যাম্বিক ফুট) থাকে। এটি সনেটের সুর ও ছন্দের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে এবং কবিতাকে একটি মধুর ও সুষম গতিতে উপস্থাপন করে।
  • মিলের ধরণ- সনেটের চরণগুলোতে নির্দিষ্ট রাইম স্কিম থাকতে হবে:
    • ইতালীয় সনেট: রাইম স্কিম সাধারণত ABBA ABBA হয়। অকটেভে প্রথম ৮টি চরণে মিল থাকে এবং সেসটেটে ৬টি চরণের মধ্যে মিল থাকে।
    • ইংরেজি সনেট: রাইম স্কিম ABAB CDCD EFEF GG হয়, যেখানে তিনটি কোয়াট্রেইনে আলাদা মিল থাকে এবং কাপলেটে একটি সঙ্কলিত মিল থাকে।
  • বিষয়ের নির্বাচন-সনেট সাধারণত প্রেম, প্রকৃতি, জীবন, মৃত্যু, দুঃখ, সুখ, মানবিক অনুভূতি বা দর্শন নিয়ে লেখা হয়। কবির ভাবনা বা অনুভূতির গভীরতা ও বিশ্লেষণ সনেটে উঠে আসে।
    • প্রথম ১২টি চরণে কবি তার অনুভূতি বা সমস্যা তুলে ধরেন।
    • শেষ ২টি চরণ (কাপলেট) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সমাধান দেয়।
  • প্রথম ৮ চরণ (অকটেভ) ও পরবর্তী ৬ চরণ (সেসটেট)
    • সনেটের প্রথম ৮টি চরণে (অকটেভ) একটি নির্দিষ্ট চিন্তা বা সমস্যার বর্ণনা করা হয়। এখানে কবি তার ভাবনা বা প্রশ্ন শুরু করেন। পরবর্তী ৬টি চরণে (সেসটেট) কবি সেই চিন্তা বা সমস্যার সমাধান, পরিণতি বা প্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করেন।
  • ভাবনা বা প্রশ্নের প্রক্ষেপণ
    • সনেট লেখার সময় কবি একটি নির্দিষ্ট ভাবনা, অনুভূতি, সমস্যা বা প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সেসটেটের মাধ্যমে এর সমাধান বা উপলব্ধি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা হয়।
  • ভাবের গভীরতা ও ভাষার ব্যবহার
    • সনেটের রচনা গভীর ভাবনা ও ভাষার সুষমতা নির্ভর করে। এটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়। সনেটের ভাষা সাধারণত পদবিন্যাসের শৃঙ্খলা, উচ্চতর শব্দ ব্যবহার এবং বিশদ ব্যাখ্যা দ্বারা শক্তিশালী করা হয়।
  • সৃজনশীলতা ও সংক্ষিপ্ততা
    • সনেটের সৃজনশীলতা তার সংক্ষিপ্ততায় থাকে। ১৪টি চরণে এক বা দুটি বিষয়কে কবি গভীরভাবে এবং সুষমভাবে উপস্থাপন করেন। এই সুনির্দিষ্ট কাঠামো কবিকে তার ভাবনা অত্যন্ত দক্ষভাবে সাজাতে ও প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

সনেট লেখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস

  • সনেটের মূল কাঠামো বা ছন্দ অনুসরণ করুন।
  • আপনার ভাবনা বা অনুভূতিকে স্বচ্ছ ও গভীরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করুন।
  • রাইম স্কিম এবং মিলের ধরন ঠিক রেখে সনেটটি সাজান।
  • শব্দচয়ন এবং বাক্য গঠন সাবলীল এবং অর্থবোধক করুন।
এই কৌশলগুলো অনুসরণ করে আপনি একটি সান্দ্র এবং শক্তিশালী সনেট রচনা করতে পারবেন, যা আপনার ভাবনা ও অনুভূতিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবে।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) এর উদাহরণ

বাংলা সাহিত্যে সনেটের প্রথম ও অন্যতম সার্থক স্রষ্টা হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি প্রথম বাংলা ভাষায় সনেট রচনা করেন, এবং তার সনেটগুলোতে প্রেম, আবেগ, দেশপ্রেম এবং মানবিকতার গভীর অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। নিচে একটি উদাহরণ দেওয়া হলো:

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সনেট "বউ কথা কও":

কি দুখে, হে পাখি, তুমি শাখার উপরে
বসি, বউ কথা কও, কও এ কাননে ?—
মানিনী ভামিনী কি হে, ভামের গুমরে,
পাখা-রূপ ঘোমটায় ঢেকেছে বদনে ?

তেঁই সাধ তারে তুমি মিনতি-বচনে ?
তেঁই হে এ কথাগুলি কহিছ কাতরে ?
বড়ই কৌতুক, পাখি, জনমে এ মনে—
নর-নারী-রঙ্গ কি হে বিহঙ্গিনী করে ?

সত্য যদি, তবে শুন, দিতেছি যুকতি;
(শিখাইব শিখেছি যা ঠেকি এ কু-দায়ে)
পবনের বেগে যাও যথায় যুবতী;
“ক্ষম, প্রিয়ে” এই বলি পড় গিয়া পায়ে!—

কভু দাস, কভু প্রভু, শুন, ক্ষুন্ন-মতি,
প্রেম-রাজ্যে রাজাসন থাকে এ উপায়ে।

এই সনেটটি একটি গভীর প্রেমের আবেদন এবং নারী-পুরুষের সম্পর্কের নানা জটিলতা তুলে ধরে। মধুসূদন দত্তের এই সনেটটি বাংলা সাহিত্যে চতুর্দশপদী কবিতার প্রথম ও সার্থক প্রয়োগ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট): সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল - FAQ

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) কী?

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট এমন একটি কবিতা যা ১৪টি চরণে গঠিত এবং এর প্রতিটি চরণে সাধারণত ১০টি সিলেবল থাকে। এটি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে লেখা হয়, যেখানে প্রথম ৮টি চরণ সাধারণত ভাবের প্রবর্তনা এবং পরবর্তী ৬টি চরণ ভাবের পরিণতি বা সমাধান নিয়ে থাকে।

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের প্রবর্তক কে?

চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেটের প্রবর্তক হিসেবে ইতালির কবি পেত্রার্ক (Petrarch) কে পরিচিত করা হয়। তবে, ইংরেজি সাহিত্যে সনেটের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য টমাস ওয়াট এবং পরে স্যার ফিলিপ সিডনি ও উইলিয়াম শেকসপিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেটের রচয়িতা কে?

বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেট রচনা করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সে বসবাসরত অবস্থায় ইতালির কবি পেত্রার্ক এর সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম বাংলা সনেট রচনা করেন।

চতুর্দশপদী কবিতার প্রধান থিম কী?

চতুর্দশপদী কবিতার প্রধান থিম সাধারণত প্রেম বা মানবিকতা হয়ে থাকে। তবে, কিছু সনেটে জীবনের অর্থ বা দার্শনিক চিন্তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

চতুর্দশপদী কবিতা কি সবসময় রোমান্টিক হয়ে থাকে?

না, চতুর্দশপদী কবিতা সবসময় রোমান্টিক হতে হয় না। যদিও প্রথাগতভাবে এটি প্রেমের কবিতা হিসেবে পরিচিত, তবে এটি জীবনের অন্য দিক, যেমন প্রকৃতি, মৃত্যু, মানবিক সম্পর্ক বা দার্শনিক বিষয়বস্তুও অনুসরণ করতে পারে।

সমাপনী কথা

চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) একটি ঐতিহ্যবাহী কাব্যশৈলী, যা সাহিত্যিক বিশ্বে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর সংজ্ঞা, ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও রচনার কৌশল তুলে ধরা হয়েছে, যা কবিতার প্রতি আগ্রহী যে কোনও পাঠককে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে সাহায্য করবে। 

চতুর্দশপদী কবিতার ইতিহাস, বিশেষ করে ইতালি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এর বিস্তার এবং বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান, কবিতার প্রতি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। চতুর্দশপদী কবিতার বৈশিষ্ট্য এবং রচনার কৌশল অনুসরণ করলে যে কেউ সঠিকভাবে সনেট রচনা করতে পারে এবং এটি সাহিত্যিক উৎকর্ষতার দিকে পথপ্রদর্শন করবে।

আপনার যদি চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন থাকে অথবা আপনার মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান, তাহলে নিচে কমেন্ট করতে ভুলবেন না!

ধন্যবাদ
সামরিন ইনফো।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

সামরিন ইনফো এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url